Saturday, January 4, 2014

তোমরা যারা আমাকে চেতনা নিয়ে প্রশ্ন করো

এবারের বিজয় দিবসটা অনেক ভালোভাবে কেটেছে ।১৬ কোটি বাঙালী এবার কাদের মোল্লা মুক্ত বিজয় দিবস উদযাপন করেছে ।এবার আমিও অনেক উত্‍ফুল্ল ছিলাম ।আবেগে ১৫ ডিসেম্বর ঘুমাতে পারিনি ।সারারাত আবেগে কেঁদেছি ।কারণ আমি জানি ,কাদের মোল্লা মুক্ত হওয়ার ফলে দেশ কি হবে ।দেশ অচিরেই সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে ।

১৬ ডিসেম্বর সারাদিন অনেক ব্যস্ত ছিলাম ।রাতে আমি কিছু সময় শিশুদের দেই ।আমি শিশুদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনালাম ।শিশুরা মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প শুনে আমাকে বললো ,স্যার আমাদের জন্ম একাত্তরে হলো না কেন?একাত্তরে জন্ম হলে আমরাও যুদ্ধে যেতাম । শিশুদের এরকম আবেগপূর্ন প্রশ্নে আমি কেঁদে ফেললাম ।চেতনা আমাকে কাঁদায় ,চেতনা আমাকে হাসায় ,চেতনা স্বপ্ন দেখায় ।এসময় একটি শিশু আমাকে বললো ,স্যার আপনি যুদ্ধে যান নি কেন?
আমি প্রশ্ন শুনেই ধারনা করলাম নিষ্পাপ শিশুটিকে হয়তো কোন শিবির ব্রেইনওয়াশ করেছে ।তারপরেও উত্তরে বললাম ,আমি যদি যুদ্ধে যেতাম তাহলে রাজাকাররা আমাকে মেরে ফেলতো ।আর আমি মরে গেলে তোমাদের চেতনার বাণী কে শোনাতো?

তোমরা যারা পাকিস্তান দুতাবাসের সামনে ইমরানকে পিটিয়েছ

তোমরা জানো আমি একটু ভীতু মানুষ ।এই ভীতু হওয়ার কারনেই ৭১ এ আমার মা আমাকে ও কাজল শর্ষীনা হুজুরের কাছে রেখে এসেছিলো ।শর্ষীনার হুজুর রাজাকার হলেও জামায়াত শিবির করতো না ।সে অনেক ভালো ।

যা বলছিলাম ,গতকাল রাতে আমি আমার এক সহকর্মীর সাথে শিবির নিয়ে কথা বলছিলাম ।সে আমাকে কথার এক পর্যায়ে বললো -জাফর স্যার ,আপনি কি কখনো গ্রিল মুরগি কাটার কাঁচি দেখেছেন? আমি বললাম হয়তো দেখেছি কিন্তু মনে নেই ।সে জানালো ঐ কাঁচি দিয়েই শিবির রা রগ কাটে ।আমি ভয়ে আতকে উঠলাম ।একটা মানুষকে আরেকটা মানুষ পুলিশের মতো গুলি করে মারে না ,ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের মতো চাপাতি দিয়ে মারে না কিন্তু কাঁচি দিয়ে রগ কেটে দেয় ।সাথে সাথে আমি শাহরিয়ার কবিরকে ফোন দিয়ে বললাম ,আপনি ৭১ এ গ্রিল মুরগি কি দিয়ে কেটেছেন? তখন সে জানালো স্প্রিং যুক্ত একধরনের ধারালো কাঁচি দিয়ে ।আমি আবারো ভয় পেলাম ।ভয়ে ভয়ে রাতে ঘুমাতে গেলাম ।

জাফর ইকবালের কলাম : তোমরা যারা ককটেল ফুটাও

আমি আমার ইউনিভার্সিটির CSE ল্যাবে আমার এক ছাত্রের সাথে বাঁশেরকেল্লা ওয়েবসাইট  নিয়ে কথা বলছিলাম ।তোমরা হয়তো জানো ,বাঁশেরকেল্লা শিবিরের ওয়েবসাইট ।আমার ছাত্রটি খুব আক্ষেপ করো বললো ,স্যার আমরা অনেক চেষ্টা করেও বাঁশেরকেল্লাকে দমাতে পারলাম না ।আমি ওকে একটা সফটওয়্যার ডিজাইন করতে বলেছি যা দিয়ে বাঁশেরকেল্লার নাম পরিবর্তন করে BALERKELLA বালেরকেল্লা লেখা যায় ।আমি Bangladesh awamileague কে সংক্ষেপে Bal বলি ।এতে এনার্জির অপচয় হয় না ।আমরা যখন এসব নিয়ে কথা বলছিলাম তখন বাইরে পারমানবিক বোমা পরার শব্দ পেলাম ।বের হয়ে দেখলাম কয়েকটা ছেলে ককটেল ফুটাচ্ছে আর বলছে তোমরা যারা ,তোমরা যারা ।আমি দেখেই বুঝলাম ওরা শিবির ।

তোমরা যারা আমার খতনা নিয়ে সন্দেহ কর

১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষন শোনার পরই আমি বাংলাদেশ কে অনুভব করেছিলাম ।সেই ২৫ মার্চের রাত থেকেই আমি পশ্চিম পাকিস্তানের পন্য বর্জন করি ।এর পর আমি কখনো পাকিস্তানের কোনো জিনিস হাত দিয়ে স্পর্শ করিনি। অনেক টাকা বেঁচে যাবে জেনেও যে প্লেন পাকিস্তানের মাটি স্পর্শ করবে আমি কোনোদিন সে প্লেনে উঠিনি। পাকিস্তানের ওপর দিয়ে যখন কোনো প্লেনে উড়ে যাই, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই দেশটির ভূমি সীমার বাইরে না যাই ততক্ষণ নিজেকে অশুচি মনে হয়। পাকিস্তান দল যত ভালো ক্রিকেট খেলা খেলুক না কেন আমি তাদের কোনো খেলা দেখি না (ষাটের দশকে টোকিও অলিম্পিকে স্বর্ণ বিজয়ী পাকিস্তান হকি টিমের একজন প্রাক্তন খেলোয়াড় পাকিস্তান মিলিটারি অফিসার হিসেবে আমার বাবাকে ৭১-এ হত্যা করেছিলো বলে আমি জানি।)

তোমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী পদার্থ বিজ্ঞান বই পড়

আমি বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছি অনেক দিন ধরে ।চেতনাধারী শিক্ষার্থীদের মাঝে যেন বিজ্ঞানী হওয়ার প্রবল আকাংখা জাগে এজন্য আমি অনেক সেমিনারে কথা বলেছি ।তবে মুল সমস্যা হলো ,আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্হায় এখনো পাকিস্তানি প্রভাব আছে ।এ শিক্ষা ব্যবস্হায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী অনেক কিছু আছে ।এসব বইতে জ্ঞ্যান অর্জনে উত্‍সাহিত না করে ,নম্বর কিভাবে বেশি পাওয়া যাবে সে ব্যাপারে উত্‍সাহিত করা হয় ।আর এসব বইতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে খুব কম কথাই আছে ।রসায়ন ,পদার্থ ,সামাজিক বিজ্ঞান ,সাধারন বিজ্ঞান ,সাধারন গণিত বইতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা গল্পও নেই ।গণিত অলিম্পিয়াডের বিভিন্ন প্রোগ্রামে আমি প্রায় বলি ,তোমরা যারা বিজ্ঞানী হতে চাও তারা কেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী বই পড়? আমি নবম দশম শ্রেণীর পদার্থ বিজ্ঞানের যতোগুলো বই পড়েছি কোন বইতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা কথাও পাইনি ।তাহলে কি আমাদের দেশে শিক্ষার্থীরা ,মুক্তিযুদ্ধের গল্প ছাড়া পদার্থ বিজ্ঞান পড়ে অপদার্থ হয়ে যাবে? না তা হতে দেব না ।আমি চেতনার অনুপ্রেরনায় এগিয়ে আসছি ।তাই নবম দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য পদার্থ বিজ্ঞানের একটা বই লিখেছি ।

আর আমি অনেক দিন ধরে একটা বিষয় লক্ষ্য করছি ।শাহবাগের চেতনাধারীরা ইতিহাস ছাড়া অন্য পরীক্ষা দিতে চায় না ।আমি বলছিনা যে ,তোমাদের সব পরীক্ষা দিতে হবে ।কিন্তু পদার্থ পরীক্ষা তোমাদের দিতে হবে ।এজন্য আমি তাদের জন্য এই বইটা লিখেছি ।তোমরা এটা পড়বে আর আমার প্রশংসা করবে ।

এই বইটা উত্‍সর্গ করেছি ,তোমরা যারা বিজ্ঞানী হতে চাও" তাদের প্রতি ।

তোমরা যারা আমার জন্মদিনে উইশ কর

দেখতে দেখতে জীবনের আরেকটি বয়সের সিঁড়ি পার হলাম। পা রাখলাম নতুন এক বছরে।এই অল্প বয়সেই দেখেছি আমার প্রতি তোমাদের ভালবাসা, উৎফুল্লতা। এ জন্য তোমাদের প্রতি আমি বিশেষ কৃতজ্ঞ।

২৩ শে ডিসেম্বর, ১৯৫২, সিলেটে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে আমার জন্ম হল। বাবা আমার নাম রাখলেন," বাবুল"

ছেলে বেলায় আমার জন্মদিন পালনকালে সবাই যখন " হ্যাপি বার্থ ডে বাবুল" বার্থ ডে সং গাইত তখন নিজেকে কেমন যেন আবুল আবুল মনে হত। 

যাক সে কথা, ৬০ বছর পেরিয়ে এখন আমি ৬১ বছরের যুবক। হ্যাঁ! ৬১ বছরের যুবক এখন আমি। তাইতো এই তারুণ্য আমি ধরে রেখেছি আমার চেতনায়, বাগ্মীতায়, চাহনিতে। কারণ আমি জানি, " দেহের বয়স বয়স নয়, মনের বয়সই প্রকৃত বয়স"

তোমরা যারা বহুবিবাহ করো

ডিসেম্বর মাসটি আমার জন্য যুগপৎ বেদনা ও আনন্দের মাস। এ মাস আমাকে নবজন্মের আনন্দে উদ্বেল করে, আবার এ মাসে আমি বেদনার আঘাতে বিক্ষত হই। আমি যখন আমেরিকার বেল কর্পোরেশন ল্যাবে রিসার্চ করতাম, ডিসেম্বর মাসটা জুড়ে কিছুই করতে পারতাম না। আমার সুপারভাইজার জানতেন এই মাসটাতে আমার মনের অবস্থা কেমন হয়। তিনিও আমাকে এসময় কোন চাপ দিতেন না। আমি তুষারপাত দেখে আর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার কথাগুলো ভেবে ভেবে ডিসেম্বর পার করতাম। 

নতুন প্রজন্মের মাথায়, চিন্তায়, বুদ্ধিতে আর কল্পনায় স্বাধীনতার চেতনা প্রোথিত করার জন্য সাধনা করাটাকে আমি এখন জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য করে নিয়েছি। তার ধারাবাহিকতায় আমাদের চুড়ান্ত সাফল্যও এসেছে। শাহবাগে নেমে এসেছে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী শক্তির কবর রচনা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ভেবেছিলাম এই আনন্দ আর প্রাপ্তির মহান বছরে ডিসেম্বরটা অন্যরকম হবে। কিন্তু এ যেন নিয়তি। আমারই পরিবারের এক সদস্য, আমার প্রয়াত সহোদরের কন্যা শিলা আহমেদ এই ডিসেম্বরকে আবারও আমার জন্য শোকাবহ করে তুললো।